সিফিলিস: কারণ, উপসর্গ, জিহ্বায় সিফিলিসের লক্ষণ ও চিকিৎসা | Syphilis in Bengali
সিফিলিস (Syphilis) হলো একটি যৌনবাহিত সংক্রমণ (Sexually Transmitted Infection – STI) যা Treponema pallidum নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এটি মানবদেহে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং সঠিক চিকিৎসা না করলে দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। প্রথমে রোগটি সাধারণত যৌনাঙ্গ, জিহ্বা বা মুখে ছোট ক্ষত দিয়ে শুরু হয়, তবে অবহেলা করলে এটি জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতে এখনও অনেক মানুষ এই রোগ সম্পর্কে সচেতন নয়। তাই সঠিক তথ্য জানা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সিফিলিসের কারণ
সিফিলিস মূলত যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ালেও আরও কিছু কারণে এটি হতে পারে। প্রধান কারণগুলো হলো—
- অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক: কন্ডোম ব্যবহার না করলে সংক্রমিত সঙ্গীর শরীর থেকে ব্যাকটেরিয়া সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।
- সংক্রমিত ক্ষতের সংস্পর্শে আসা: মুখ, জিহ্বা বা যৌনাঙ্গের ক্ষত থেকে ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে।
- মা থেকে শিশুতে সংক্রমণ (Congenital syphilis): গর্ভবতী মা যদি সিফিলিসে আক্রান্ত হন, তবে জন্মের সময় শিশুর মধ্যে সংক্রমণ যেতে পারে।
- রক্ত সঞ্চালন: সঠিকভাবে পরীক্ষা না করা রক্ত দিলে সংক্রমণ হতে পারে।
সিফিলিসের পর্যায় ও উপসর্গ
১. প্রাথমিক পর্যায় (Primary syphilis)
- সংক্রমণের ১০–৯০ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়।
- সাধারণত যৌনাঙ্গ, ঠোঁট বা জিহ্বায় একটি ছোট, শক্ত ও ব্যথাহীন ক্ষত (chancre) তৈরি হয়।
- এই ক্ষত প্রায় ৩–৬ সপ্তাহে নিজে থেকে সেরে যায়, কিন্তু সংক্রমণ শরীরে থেকে যায়।
২. দ্বিতীয় পর্যায় (Secondary syphilis)
- ক্ষত সেরে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর দেখা দেয়।
- ত্বকে ফুসকুড়ি, বিশেষ করে হাতের তালু ও পায়ের পাতায়।
- জ্বর, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, অবসাদ ইত্যাদি সাধারণ উপসর্গ।
- জিহ্বা বা মুখের ভেতরে সাদা দাগ, আলসার বা ফুসকুড়ি হতে পারে।
৩. সুপ্ত পর্যায় (Latent syphilis)
- এই পর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না।
- শুধু রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ ধরা পড়ে।
- সুপ্ত পর্যায় অনেক বছর স্থায়ী হতে পারে।
৪. তৃতীয় পর্যায় (Tertiary syphilis)
- চিকিৎসা না হলে ১০–৩০ বছর পর এই পর্যায় শুরু হয়।
- হৃদপিণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়।
- অন্ধত্ব, পক্ষাঘাত, মানসিক সমস্যা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
জিহ্বায় সিফিলিসের লক্ষণ
সিফিলিস সব সময় যৌনাঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জিহ্বা ও মুখেও দেখা দিতে পারে। প্রধান লক্ষণগুলো হলো—
- জিহ্বায় ছোট, শক্ত ও ব্যথাহীন ক্ষত (chancre)
- সাদা বা লালচে দাগ
- মুখের ভেতরে আলসার বা ঘা
- গলায় ব্যথা বা ফোলাভাব
- দীর্ঘদিন অবহেলা করলে খাবার খেতে অসুবিধা হতে পারে
জিহ্বায় এই উপসর্গগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি, কারণ এগুলো সহজেই সেকেন্ডারি সিফিলিসে রূপ নিতে পারে।
সিফিলিসের নির্ণয়
চিকিৎসক সাধারণত কয়েকটি পরীক্ষা করে সিফিলিস শনাক্ত করেন। সেগুলো হলো—
- শারীরিক পরীক্ষা: ক্ষত, ফুসকুড়ি বা মুখের ভেতরের আলসার পরীক্ষা।
- রক্ত পরীক্ষা: VDRL (Venereal Disease Research Laboratory), RPR (Rapid Plasma Reagin) এবং TPHA (Treponema pallidum hemagglutination assay)।
- গর্ভবতী মায়েদের স্ক্রিনিং: শিশুর জন্মগত সিফিলিস প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সিফিলিসের চিকিৎসা
সিফিলিস একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিলে রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।
- প্রধান চিকিৎসা: Benzathine Penicillin G ইনজেকশন।
- বিকল্প চিকিৎসা: যারা পেনিসিলিনে অ্যালার্জি আছে, তাদের জন্য ডক্সিসাইক্লিন বা আজিথ্রোমাইসিন।
- যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা: চিকিৎসার সময় সম্পূর্ণরূপে যৌন সম্পর্ক এড়ানো উচিত।
- সঙ্গীর চিকিৎসা: সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গীকেও পরীক্ষা ও চিকিৎসা করতে হবে, নাহলে পুনরায় সংক্রমণ হতে পারে।
সিফিলিস প্রতিরোধে করণীয়
- সর্বদা সুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক বজায় রাখা (কন্ডোম ব্যবহার করা)।
- একাধিক যৌনসঙ্গী এড়ানো।
- নিয়মিত STI টেস্ট করানো।
- গর্ভবতী মায়েদের রুটিন সিফিলিস স্ক্রিনিং করানো।
- সংক্রমিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পূর্ণ কোর্স ওষুধ খাওয়া।
কেন সময়মতো চিকিৎসা জরুরি?
সিফিলিস প্রাথমিক পর্যায়ে খুব সহজেই ধরা পড়ে এবং চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু অনেকেই প্রাথমিক ক্ষতকে অবহেলা করেন, কারণ এগুলো ব্যথাহীন হয় এবং নিজে থেকে সেরে যায়। ফলে রোগী চিকিৎসা নেন না। এভাবেই সংক্রমণ শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
তাই মুখে বা জিহ্বায় কোনো অস্বাভাবিক ক্ষত, সাদা দাগ বা আলসার হলে অবিলম্বে ডাক্তার দেখানো উচিত।
উপসংহার
সিফিলিস একটি যৌনবাহিত সংক্রমণ যা অবহেলা করলে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তবে সুখবর হলো—এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। সঠিক সময়ে চিকিৎসা, নিয়মিত পরীক্ষা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিলে সিফিলিস থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা সম্ভব।
চমৎকার প্রশ্ন 🙌 আপনার ব্লগ আর্টিকেলে FAQ (Frequently Asked Questions) সেকশন যোগ করলে গুগলে Featured Snippet ও People Also Ask বক্সে র্যাঙ্ক করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। আমি এখন বাংলায় SEO-ফ্রেন্ডলি FAQ সেকশন লিখে দিচ্ছি:
❓ সিফিলিস সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. সিফিলিস কী?
সিফিলিস হলো একটি যৌনবাহিত সংক্রমণ (STI), যা Treponema pallidum নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এটি প্রথমে মুখ, জিহ্বা বা যৌনাঙ্গে ক্ষত দিয়ে শুরু হয় এবং চিকিৎসা না করলে শরীরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে।
২. সিফিলিসের প্রাথমিক উপসর্গ কী কী?
প্রাথমিক পর্যায়ে সিফিলিসের প্রধান উপসর্গ হলো ব্যথাহীন শক্ত ক্ষত (chancre), যা সাধারণত যৌনাঙ্গ বা জিহ্বায় হয়। এটি ৩–৬ সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকে সেরে যায়, কিন্তু রোগ শরীরে থেকে যায়।
৩. জিহ্বায় সিফিলিস হলে কেমন লক্ষণ দেখা যায়?
- জিহ্বায় ছোট ব্যথাহীন ক্ষত
- সাদা বা লালচে দাগ
- মুখের ভেতরে আলসার বা ফুসকুড়ি
- গলায় ব্যথা বা ফোলাভাব
৪. সিফিলিস কি চিকিৎসাযোগ্য?
হ্যাঁ, সিফিলিস সম্পূর্ণ চিকিৎসাযোগ্য। সাধারণত Benzathine Penicillin G ইনজেকশন ব্যবহার করে এই রোগ সারানো হয়। পেনিসিলিনে অ্যালার্জি থাকলে বিকল্প অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
৫. সিফিলিস হলে কি সবসময় উপসর্গ দেখা যায়?
না। সুপ্ত পর্যায়ে (Latent stage) কোনো উপসর্গ থাকে না। শুধু রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ ধরা পড়ে।
৬. গর্ভবতী মায়ের সিফিলিস হলে কী হয়?
গর্ভবতী মায়ের শরীরে সিফিলিস থাকলে তা শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে জন্মগত সিফিলিস (Congenital syphilis) হতে পারে। তাই গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত সিফিলিস টেস্ট করা জরুরি।
৭. সিফিলিস প্রতিরোধের উপায় কী?
- সর্বদা কন্ডোম ব্যবহার করা
- একাধিক যৌনসঙ্গী এড়ানো
- নিয়মিত STI টেস্ট করানো
- সংক্রমিত সঙ্গীর চিকিৎসা করা
- গর্ভবতী অবস্থায় সিফিলিস স্ক্রিনিং করা
৮. সিফিলিস কি প্রাণঘাতী হতে পারে?
হ্যাঁ, চিকিৎসা না করলে সিফিলিস তৃতীয় পর্যায়ে গিয়ে মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র ও হৃদপিণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে পক্ষাঘাত, মানসিক অসুস্থতা, অন্ধত্ব এবং মৃত্যুও হতে পারে।